-|ট্রেন|- Rimi Choudhury

দিনটা ছিল 12/06/2018,আমি তখন শিয়ালদহ স্টেশনে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস এর জন্য অপেক্ষায়। অবশেষে ট্রেন আসলো এবং ট্রেনে উঠলাম । অনেকগুলো লাগেজ ব্যাগ ছিল , তাই ব্যাগগুলো কে ঠিক জায়গায় রেখে বসতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম যে আমি উইন্ডো সিট পাইনি। ঠিক তার পাশের সিটটা পেয়েছি। মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেল। ভাবতে লাগলাম ,”কে ই বা আসবে ? আমার পাশে এসে বসবে আর ওভাবে মাঝে বসতে পারবো না আমি।

তাই যেই আসুক না কেন তাকে অনুরোধ করবো উইন্ডো সিট টার জন্য।” ট্রেন ছাড়ল 6:35 মিনিটে। তখনো কেউ এলো না। হঠাৎ দেখলাম একজন লোক সামনে এগিয়ে আসছে সিট নাম্বার দেখতে দেখতে।

indian-railway-reservation360829833754150304.jpg

আমার সামনে এসে যখনই দাঁড়ালো আমি তাকে বলে উঠলাম,”এই উইন্ডো সিট’ টা কি আপনার?” সে ঘাড় নাড়ালো এবং তা দেখে খুব পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে তিনি সেই জানালার পাশে থাকা সিট টার অধিকারী। আমি তাকে বলে উঠলাম ,”আসলে আমার একটু অসুবিধা আছে , আমি এই উইন্ডো সিট টা নিতে পারি?” সে আর কিছু বলতেই পারে নি, হ্যাঁ বলল আমাকে। বেশ আমি শান্ত মনে বসে পড়লাম গিয়ে আমার প্রিয় জানালার পাশে। আমার পাশে ব্যাগটা রেখে ছেলেটি দরজার সামনে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। আমি একটু ঘুরে ঘুরে চাইছিলাম তার দিকে। লাল চেক চেক শার্টটা এবং ডেনিম এর প্যান্টটা তাকে বেশ ভালোই মানিয়ে ছিল। আর তার সাথে শার্টের হাতা গুলো ফোল্ড করে রাখায় তাকে দেখতে খুবই হ্যান্ডসাম লাগছিল। ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় তার চুলগুলো হাওয়ায় দুল ছিল আর সেটা দেখে কোন ভাবেই চোখ সরাতে পারছিলাম না। দেখলাম ট্রেন দক্ষিণেশ্বর পার হয়ে যাওয়ার পরে সে এসে বসল আমার পাশে। বেশ ভালো লেগেছিল তখন। কিন্তু কথা কম বলে দেখে ই মনে হচ্ছিল।

আর হ্যাঁ ঠিক যেন ‘রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা’। মানে মুখে হাসি একেবারেই নেই বললেই চলে। অনেকক্ষণ এভাবে কেটে গেল কেউ কারো সাথে কথা নেই ।যে যার মতন কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছি।একবার হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো ।তার কোন বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল ট্রেনে। তাদের সিটের সামনে গিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ আমার চোখের সাথে চোখ পড়ে গেল তার ।আমাকে দেখে সে চোখটা

img_91601796460634655839505.jpg

আলতো করে নিচে নামিয়ে নিলো এবং মুখে একটা মুচকি হাসির প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম। ঠিক সেই সময় পাশেই একটা বাচ্চা মেয়ে এসে শুয়ে গিয়েছিল। বেচারার অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল।কিন্তু কিছু বলতে পারছিল না । আমার সত্যি ই খুব খারাপ লাগছিল। আর এই খারাপ লাগাটা যতটা না তার দাঁড়িয়ে থাকবার জন্য , তার থেকে অনেক বেশি আমার পাশে এসে বসতে না পারার জন্য। যাই হোক তখন মেয়েটির মা তাকে উঠিয়ে নিয়েছিল এবং তারপর সে এসে বসল আমার পাশে। সত্যি বলতে আমি তখন ক্রাশ খেয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু মনের মধ্যে একটাই কথা আসছিল। “কথা কেন হচ্ছে না আমাদের মধ্যে!”….. হঠাৎ পাশে একজন ভদ্রলোক এসে বসলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে এখন কোন স্টেশন। তার উত্তরে ছেলেটি একটি অন্য স্টেশনের নাম বলল।আমি তৎক্ষণাৎ তার উত্তরে বলে উঠি যে না ! এটা সাইথিয়া। তারপর থেকেই কথা বলা শুরু হল আমাদের। আমি বলে উঠি ট্রেনটা অনেকটাই লেট যাচ্ছে। সে বলল হ্যাঁ লেট ই যাচ্ছে ।এই ভাবেই কথাবার্তার আরম্ভ হলো আমাদের।সে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় যাচ্ছেন আপনি? আমি বলে উঠলাম অনেক দূরে।রাত হবে পৌঁছতে , আলিপুরদুয়ার যাচ্ছি আর আপনি? সে বলে উঠলো আর বেশি দূর নয় সামনে ই। তারপর পুরোদমে কথা বলা শুরু হয়েছিল। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই এই কথোপকথন চলতে লাগলো সে নামার আগ পর্যন্ত ।

আমাদের মধ্যে কথা বলা চলছিল এবং তারই মধ্যে বুঝতে পারলাম যে সে জাতি তে মুসলিম। তবে এতে আমার কোনো রকম কোনো কিছু মনেই হয়নি । মানলাম আমি হিন্দু আর সে মুসলিম কিন্তু তাতে কি? জাতপাত ধর্ম বিদ্বেষ এ সকলের উপর আমার আগাগোড়াই সেরকম কোনো বিশ্বাস ছিল না। আমি মানতাম না ওসব। যাই হোক দারুন লাগলো তার সাথে কথা বলতে। বুঝলাম যে সে খুবই ভদ্র এবং নম্র বটে। এখন ও সে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছে না।সত্যি বলতে,কি করে কথা বলতে বলতে সময় কেটে গিয়েছিল বুঝতেও পারিনি। এবং এরই মধ্যে তার স্টেশন এসে পৌঁছলো।নামার আগে ফেসবুকের আইডিটা যেনে নিয়ে রিকোয়েস্ট পাঠালাম । মনের মধ্যে এটা চলছিল , কথা চালিয়ে যেতে হবে।সে নেমে গেল। এতটা মন খারাপ হয়েছিল যেন খুব কাছের কেউ দূরে চলে গেল।

save_20181102_2036373386783868022951202.jpeg

আবার একা একা ট্রেনে বসে তারই কথা ভাবতে ভাবতে চলে আসলাম বাড়ীতে । এসে দেখলাম সে মেসেজ করেছে। বাড়ি পৌঁছে গেছি কিনা তার খবর নিচ্ছে। আমার ওটা দেখে এতটাই ভাল লেগে গিয়েছিল যে সঙ্গে সঙ্গে তাকে রিপ্লাই দিলাম। এভাবে আমাদের মধ্যে কথোপকথন চলতে শুরু করলো।ভালো লাগা থেকে কোন দিন যেন সেটা ভালোবাসায় পরিনত হয়ে গেল।কিন্তু তার দিক থেকে আসতে চাইছিল না সে।কারণ সে নিজের পড়াশুনার দিকেই থাকতে চেয়েছিল । তার জীবন ওটাই এবং ওটা কে সে জীবনের সবচেয়ে বেশি দামি জিনিস বলে গণ্য করে।আমাকে অনেক ভাবে বুঝিয়ে ছিল, যাতে এসবের মধ্যে না চলে আসি দুজনে।

কিন্তু আমি তো তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আর তার না বলার পেছনে আরও একটা কারণ ছিল আমি হিন্দু আর সে মুসলিম। আমার পরিবার থেকে ঝামেলা হবে জন্য সে না করেছিল । কিন্তু তারও আমার ওপরে একটা টান ছিল। বুঝতে পারতাম। একদিন আমাদের মাঝে ঝামেলা হয়েছিল। আমি সেদিন ঠিক করেছিলাম যে যখন ভালোবাসে না তাহলে আমি সরে ই যাই। কিন্তু সেদিন সে আমাকে আর যেতে দেয়নি তার জীবন থেকে । হ্যাঁ এখন আমরা দুজনই দুজনকে পাগলের মতো ভালোবাসি । সে আমাকে খুবই ভালবাসে। আমরা দুজনে দুজনকে নিয়ে অনেক অনেক খুশি ।এখন আমি তার জীবন । ভালোবাসা আমার জীবনে এ ভাবে আসবে কখনোই ভাবেনি ।এত একজন ভালো মানুষকে জীবনে পেয়েছি যাকে কখনোই হারাতে চাই না ।আসলে রাখতে চাই আমার সেই ভালোবাসার Boss কে আমার সাথে। সত্যি বলতে ট্রেনের একটা ছোট্ট যাত্রা দুজনের জীবন কে একে অপরের সাথে এইভাবে যুক্ত করে দেওয়ার মতন ক্ষমতা রাখে তা এই প্রথম উপলব্ধি করলাম।আমি তাকে ভালোবেসে boss বলি আর সে আমাকে বলে Chand……..

(BASED ON A TRUE STORY)

Author

Rimi Choudhury…

0 Shares

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.