|| প্রেম ||~সৃষ্টি সরকার

ভালবাসা কি তবে দোষের !

আজ বহু বছর পর , অষ্টমীতে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে , তোমার সেই প্রিয় গান, “আমারও পরান যাহা চায় ” মাইকে শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল তোমার কথা ।

প্রেম

তখন আমি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ।
কলেজে ভর্তির বহুদিন আগে থেকেই তোমাকে চিনতাম আমি । যদিও তোমাকে আপনি বলা উচিত, সিনিয়র আবার গেস্ট প্রফেসর বলে কথা ।


অনেক ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি তোমাকে, কিন্তু পৃথিবীর সব কিছু কন্ট্রোল করা গেলেও, কারো প্রতি ভালবাসা তো আর কন্ট্রোল করা যায় না ।

প্রেম

অন্যান্য লেকচার মিস করলেও কোনো ব্যাপার না, কিন্তু অন্তরা দির ক্লাস করতেই হবে ।
সপ্তাহে একটা ক্লাস , আর সেই একদিনই ছিল আমার কাছে , তোমাকে আত্মস্থ করার ।
এতটাই মনোযোগ দিয়ে তোমার লেকচার শুনতাম, তোমার পড়ানো সেই বিষয় গুলো বাড়িতে আর পড়তে হতো না ।
ম্যাডাম বলে কথা , কোনো সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস আমার ছিল না ।
বড় দাদা দিদিদের মুখেই তোমার কিছু ভালো লাগা গুলো শুনেছিলাম । তোমার রবীন্দ্রনাথ প্রিয় বলে , সব সময় রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতাম , যদি কোনোদিন এক লাইন হলেও তোমার জন্য গাইতে পারি । বৃষ্টির জলে যেমন গাছের পাতা গুলো কে স্বতঃস্ফূর্ত দেখায়, তেমনি তোমার আগমনেও ক্যাম্পাসে সবার মুখে একটা আনন্দ ভেসে উঠতো । পড়াশোনার বাইরেও কার কি সমস্যা, সবার একটাই সমাধান ছিল অন্তরা দি । সবার বিপদে আর কেউ থাকুক চাই না থাকুক ডাক্তার অন্তরা চ্যাটার্জি থাকবেই ।

প্রেম

কত দিন সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করেছি , তোমার সাথে একটু কথা বলবো বলে , এত সুন্দর আর এত মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব যে সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে শুধু একটা মুচকি হাসি ছাড়া আর কিছুই বলা হয়ে উঠেনি ।
আমার আলমারিতে এখনো রাখা আছে সেই নীল মলাটের ডায়েরিটি , যেখানে লেখা আছে তোমাকে না বলা কথা গুলো , লাল টিপ তোমাকে ঠিক মানায় না , কালো টিপেই তুমি অপরূপা , আর খোলা চুলের সঙ্গে শাড়ি পিন করে না পড়লেই বেশি ভালো লাগতো তোমায় , খয়েরি চশমার
ফ্রেমটা ভীষণ সুন্দর , হলুদ lays এর প্যাকেট মনে হয় খুব পছন্দের , রাজু দার দোকান থেকে তো দেখতাম সেটাই কিনতে
প্রতিদিন , এরকম হাজারো না বলা কথা লেখা আছে , আলমারির সেই ডায়েরিতে ।
কলেজ পেরিয়ে এখন আমি দেশের সর্বপরিচিত বেসরকারী নার্সিং হোমে প্র্যাকটিস করছি ।
তুমি আমার থেকে আট বছরের বড় ছিলে বলে, কোনো প্রবলেম ছিল না আমার, ভালবাসা তো আর ধর্ম-বর্ণ-জাত-সম্পত্তি-লিঙ্গ দেখে হয় না ।


তাছাড়া আমি যখন মেডিকেল কলেজ থেকে পড়ে বের হলাম , তার দুবছর আগেই তোমার বিয়ে হয়ে গেছে ।
ভালোবাসা সত্যি ছিল বলে, আর অন্য কোনো মেয়েকে ডাক্তার চ্যাটার্জির মতো ভালবাসতে পারবো না বলে বিয়েটা আর আমার করা হয় নি ।
রোগীদের সেবায় ভালোই দিন কাটাচ্ছিলাম , কিন্তু সেদিন চার নাম্বার রুমে রোগী দেখতে না গেলে হয়তো জানতেই পারতাম না, এত গুলো বছর তুমি কত কষ্টে করে কাটিয়েছো ।
স্বামীর মৃত্যু তুল্য অত্যাচারের পরেও কেন পড়ে ছিলে ওই পশুটির কাছে ?

প্রেম

শুধু নিজের মেয়ে পুতুলের জন্য ? আলাদা তো হয়ে যেতে পারতে । কিন্তু আলাদা হবেই বা কি করে , মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছো, শুনলাম তিন বছর হয়েছে , কেউ মাথায় এভাবে আঘাত দেয় !
আর পুতুল তখন একদম ছোটো ।
স্থানীয় হাসপাতাল থেকেই তো ট্রান্সফার করা হয়েছে আমার কাছে । আমার অন্তরা দির সাথে গল্প করার কি ইচ্ছে ছিল, ঔষধের পাশাপাশি , এখন ডেইলি আমি পনেরো মিনিট গল্প করি ( কাউন্সিলিং) তোমার একাকীত্ব
দূর করার জন্য । কিন্তু তোমাকে তো এভাবে দেখতে চাই নি আমি ।
সব সময় চেয়েছি তুমি যাতে ভালো থাকো, কোথায় আর , নিজের মেয়েকেই তো ভুলে গিয়েছো , যদিও সে তার দাদু দিদার কাছে ভালো আছে ।
তোমার এই অবস্থার জন্য আমিও দায়ী, আমি যদি সাহস করে , তোমাকে আমার মনের কথা বলতাম হয়তো তুমি মেনে নিতেই পারতে আমাকে । দোষ আমারও, আমি তো সাহস করে তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতেই পারিনি , এখন না হয় তোমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমার ।

~~~~~~°°~~~~~~°°~~~~~~~~°°~~~~~~

বি:দ্র: = কাউকে ভালবাসলে , তাকে সাহস করে বলে দেওয়া উচিত । কাউকে ভালোবাসা কখনো অন্যায় না ………

Author

~Sristi Sarkar

0 Shares

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.