২০দিন ধরে অনশনকারী এক বেকার হবু শিক্ষকের চিঠি !! বিস্তারিত পড়ুন 👇

প্রিয় মা,
ভালো আছো তো ? হাঁটুব্যাথার ঔষধটা খাচ্ছো তো ঠিকঠাক? এই যা, আমিও কেমন ভুলে গেছি যে তোমার আর মাত্র পাঁচদিনের ঔষধ ছিল। অথচ আজ কুড়িদিন! আমি জানি তোমার ব্যথার ঔষধটা কোনটা। আশা ছিল পাঁচদিন পরই সেটা নিয়ে যেতে পারবো। তাইতো তোমার দেওয়া মুড়ির পুঁটলিটা একবারও খুলিনি,ভেবেছিলাম ব্যথার ঔষধের প্রেসক্রিপশনটা পেয়ে গেলেই পুঁটলিটা খুলবো! কিন্তু মা, তুমি হয়তো চিন্তা করছো যে মুড়িগুলো সেই কবেই ফুরিয়ে গেছে,হয়তো ভেবেছিলে যে চাকরী অফিসে কাজ সেরেই রাতে ফিরবো বা অভীকের মেসে রাতটা কাটিয়ে তারপরের দিন! না গো মা, পুঁটলিটা এখনও পুরোটাই আছে যেমন করে বেকার ছেলেটার পুরো বোঝা তুমি কাঁধে নিয়েও পুরো স্নেহটাই দিয়ে যাচ্ছো!

বাবা মারা যাওয়ার পর পুকুরের অংশটা বিক্রী করে আমার বি.এড-এর ভর্তির টাকাটা দিয়েছিলে বলে বাড়িতে মাছও হ’তই না প্রায়, অথচ তুমি দুধ বিক্রীর ৩০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলে হোটেলে যেন মাছভাত খাই। মা জানো তো, ট্রেনে আসতে আসতে কত হকার ছোলা, বাদাম, গরমাগরম দিলখুশ, মশলামুড়ি, চপে কানটা ঝালাপালা করে দিল। বিশ্বাস করো মা, এখানে হকাররাও লজ্জায় আসেনি গো! নীতু কাকিমা হয়তো বলবে আমরা লোকের সামনে খাইনি কিন্তু অনুপ্রেরণা দাত্রী কারুর মতো হয়তো লুকিয়ে স্যান্ডউইচ, চিকেন পকোড়া খাচ্ছি! যদি আমাকে আর দেখার সুযোগ হয় তবে দেখবে, একথা একেবারে সত্যি নয় গো! তবে, নীতু কাকিমাই বা দেখবে কেমন করে, উনার ফ্রি খবরের চ্যানেলে তো আবার আমাদের খবর দেখায় না গো! আমরা কি আর আবেশ বা সিবিআই বা ইলেকশন কমিশনের বিরুদ্ধে ধর্না দিয়েছি যে খবর খাবে লোকে ?তুমি হয়তো ভাবছো যে সেই তপতীকে পাটক্ষেতে খেতে টেনে নিয়ে যাওয়া কালু শেখকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার মতো করে আমরাও অন্যায়ভাবে চাকরী আদায়ের জন্য এখানে আন্দোলন করে যাচ্ছি! বছর দুয়েক আগে তুমি সেই যে আমার পাশ করার কথা শুনে আনন্দে চোখে জল ফেলেছিলে না, তারই শেষকৃত্য করছি গো সবাই মিলে! এর থেকে নিজেদের পিন্ডি নিজেরাই দেওয়া কী এমন কষ্টসাধ্য বলো!

নীতু কাকিমা, উচ্চমাধ্যমিকে ২ বার কম্পার্টমেন্টাল পাওয়া দশলাখি প্রাইমারীটিচার রনির মায়ের মতো অনেকেই হয়তো ভাবছে আমরা পাশ না করেই…….! কিন্তু মা তুমি তো জানো এ রাজ্যে– চাকরীর বিজ্ঞাপন বের করানো, তার সংশোধন করানো, পরীক্ষা নেওয়ানো, সাদা খাতা, লিখিত পরীক্ষার রেজাল্ট বের করাতে, ইন্টার্ভিউ করানো, আবারও ফাইনাল রেজাল্ট বের করানো, পিডিএফ, কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে জয়েনিং করানো পর্যন্ত সবকিছুতেই আন্দোলন করতে হয়!

আর যে উপায় নেই মা। আমার কাছে প্রকাশ না করলেও রান্নার সময় উনুনের ধোঁয়ার মাঝে তোমার চোখে জল দেখেছি। রাত্রে তোমার চোখে ঘুম নেই, আমিও একটা ঘুমোইনি মা। আগে নন্দিনীর সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে রাঙাসূর্য লজ্জা দিত! আজও রাঙা লজ্জা দেয়, তার রাঙাসিঁথি! জানো মা, আজ একটুও খিদে নেই-কারুরই নেই। বুকের বাঁদিকের লজঝড়ে টাইপমেশিন, সাদাপোশাকের বীরপুঙ্গবদের রক্তচক্ষু আর হাল্কা কিছু দরদ, টকঢেকুর আর লো-প্রেসার নিয়ে এই বেশ ভালো আছি!
আজ হয়তো ইতিহাস নিয়ে না পড়ে জেক্সপোতে র্যঙ্ক করার পর ডিপ্লোমাটা করে নিলেই আজ রাজপথে আন্দোলনের সুযোগ(!)টা পেতাম না! আসলে তখন তো সবাইকেই প্রতিবছর এস.এস.সি দিতে দেখেছি,জানতাম একবার ঠিক শিকে ছিঁড়বে! কিন্তু বদল করতে গিয়েই, “উল্টে দেখি পাল্টে গেছি!” কেউ কি আর ভাবতে পেরেছিল যে মৌসিনরাম হঠাৎ গোবি হয়ে উঠবে!

আজ আমার একটুও কষ্ট নেই, আজ আমি আমার মতোও নই! আমার সাথে কত দাদা-দিদি-ভাই-বোনকে দেখছি ক্রমশ রঙ হারিয়ে ধূসর হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নগুলো সব শাসকের লোভের লেলিহান শিখায় কেমন করে ছাই হয়ে যাচ্ছে! মাঝেমধ্যে ডোমের লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার স্ট্রেচারে করে আমাদের জীবন্ত লাশগুলোও হাসপাতালে পাচার করে দিচ্ছে।
জানো মা, কথা বলার শক্তি পর্যন্ত নেই। ফোন করার চার্জ নেই। আর ফোন করলেই বা কী! ৩৫ টাকার জন্য বড়বাবুরা আবার তোমার থুড়ি আমার বাতিল ফোনটায় ইনকামিংও বন্ধ করে দিয়েছে! এবার তো শুধু অক্সিজেনের ইনকামিং বন্ধ হওয়ার পালা!
তুমি ওই ভাঙা চালটা দেখিয়ে বলেছিলে না এবারের বর্ষায় একটা ত্রিপল কিনে আনতে? আমাদের কাছে এখন একটা নয়, দু-দুটো ত্রিপল! সেদিনের ঝড়বৃষ্টিতে আমার হাত দিয়ে ধরেছিলাম। আমাদের কারুর মাথা ভেজেনি গো! পা কাঁপছে, হাত কাঁপছে, তাও ধরে রেখেছি! তাইতো, হাত কাঁপলেও আজ আমি এ চিঠি ঠিকই লিখে যাচ্ছি!

জানো মা, আমার না দেওয়ালে পিঠটা ঠেকে গেছে। দেওয়াল সরানো তো দূর অস্ত, পাল্লা খোলারও শক্তিটুকু নেই! এই তো সেদিন দিদিটার দুষ্টুটা পেটেই হারিয়ে গেল! আজ আমিও এইভাবে পড়ে পড়ে হারিয়ে না গিয়ে ওভাবেই যদি……..! জানো মা, আমাদের বোধহয় আর বাঁচা হবে না! এই রাষ্ট্র, এই সিস্টেম, এই “লোকে কী বলবে” গুলো বোধহয় আর বাঁচতে দেবেনা!
জানি তুমি কেমন থাকবে তবুও বলছি ভালো থেকো মা। চিন্তা করোনা! ওষুধটা পেয়ে গেলে আমি আসছি। নাহলে……! মায়ের কোলে মাথা রেখে……….., ক’টা ছেলেরই বা সৌভাগ্য হয় বলো?!

ইতি-
তাং-২০/০৩/২০১৯
C/O- রাজপথ রাকেশ

Join Our Telegram Group

এই রকম আরও বিভিন্ন নিউজ সম্বন্ধে জানতে আমাদের ফেসবুক পেইজটি লাইক করে রাখুন। Netdarpan এর ফেসবুক পেইজ লাইক করার সাথে সাথে আমাদের ওয়েবসাইট কে Subscribe করে রাখুন সকল নিউজ তৎক্ষণাৎ আপনার কাছে পৌঁছে যাওয়ার জন্য।। এতে পশ্চিমবঙ্গ , ভারতবর্ষ এবং সারা বিশ্বের বিভিন্ন কোনায় ঘটে ধাকা বিভিন্ন রকমের খবর সম্বন্ধে আপনারা বিস্তারিতভাবে সম্পূর্ণভাবে আপডেটেড থাকতে পারবেন। ধন্যবাদ।।

0 Shares

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.