পশ্চিমবঙ্গের এক চাকুরীপ্রার্থীর চোখে জল নিয়ে আসা দুঃখের চিঠি!! পশ্চিমবঙ্গে চাকরির সত্যতা!!!!

একদিন না খেয়ে থেকেছেন কখনো? একবেলা তো থেকেছেন। শরীর কেমন অবসন্ন হয়ে যায়না? পা টলমল,মাথা ঝিমঝিম,এক দুর্বলতা আচ্ছন্ন করে ফেলে শরীরকে। কষ্টটা অনুভব করতে পারছেন? আচ্ছা এই উপোস যদি ৭ দিন হয়। কতোটা ক্ষতি হতে পারে শরীরের? আর যদি এটা তিন সপ্তাহ পেরিয়ে ২২ দিনে পরে। ভাবতেই শরীরটা কেমন অবশ হয়ে এলো না?

হ্যাঁ ২১ দিন পেরিয়ে গেলো অনশন। হচ্ছে কোথায়? এই বাংলা, এগিয়ে থাকা বাংলা, বিশ্ববাংলা, মানবিক বাংলা, উৎসবের বাংলার বুকে খোদ কলকাতার রাজপথে। করছে কারা? করছে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম,করছে সেই সব ছেলেমেয়েরা যারা চপ ভাজা আর টোটো চালানোর বাইরে স্বপ্ন দেখেছিল এক সম্মানের জীবনের,স্বপ্ন দেখেছিল এক স্থায়ী চাকরি,এক নিশ্চিন্ত জীবনের।অনশন করছে উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা, যারা MA,B,Ed, B,P,Ed করে এসএসসির প্যানেলভুক্ত হয়েও চাকরি পাচ্ছেনা সরকারের সদিচ্ছার অভাব। অনশন করছে তারা, যারা ক্লাবের মত্ততায় না মেতে, তাস পাশার আকর্ষণ ছেড়ে আঁকড়ে ধরেছিল বই খাতা। তারা বোঝেনি পরিবর্তনের রাজ্য তাদের এভাবে পথে বসাবে।বোঝেনি চটির তলায় দুমড়ে মুচড়ে যাবে স্বপ্ন।

এদের দাবী কী? সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব। অনশনের কথা, শতাধিক উচ্চশিক্ষিত যুবক যুবতীর তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার কাহিনী, এক বঞ্চিত প্রতিবাদী মা এর গর্ভস্থ শিশু হারানোর মর্মান্তিক বেদনার কথা উপেক্ষিত রয়েছে পদলেহনকারি মিডিয়ার কাছে।তাই সমাজ জানতে পারছে না এদের দাবি দাওয়ার কথা।

এদের দাবি সামান্য। এসএসসির নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে হবে। এরা বলছিলেন, এসএসসি র নিয়োগ প্রক্রিয়া বর্তমানে অদ্ভুত ধরনের গোপন ও অস্বচ্ছ। বর্তমান এসএসসির রেজাল্ট বেরোয় এসএমএসে। কজন পেলো, rank কী হলো,কজন ওয়েটিংয়ে থাকলো, স্কোর কতো হলো কেউ জানতেই পারেনা। আর এই ধোঁয়াশার মাঝে উড়ে বেড়ায় দুর্নীতি,নেতার কোটা,লাখ লাখ টাকার রফার গল্প। মেধাতালিকা রাতারাতি বদলে যায় কোনো অদৃশ্য ইশারায়, সাদা খাতা জমা দিয়ে চাকরি পাওয়ার কাহিনী শোনা যায়, দল বদলানো নেতার মেয়ে সবাইকে টপকে চাকরি পেয়ে যায়, এসএসসির চেয়ারম্যান বদলে যায় ঘন ঘন,প্রশ্ন গায়েব হয়ে যায় বাস থেকে,মামলার পাহাড় জমে, আর এইসব এর মধ্যে পড়ে বেকার যুবক যুবতীরা পথে বসতে বাধ্য হয়। সততার বাংলায় স্বচ্ছ নিয়োগ এতোটাই মহার্ঘ হয়ে গেলো যে তার দাবীতে অনশনে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হবে যুবসমাজকে? এ লজ্জা রাখবো কোথায়?

এদের পরের দাবী, ভ্যাকানসি লিস্ট প্রকাশ করতে হবে। কী এমন অন্যায্য দাবি,যে সরকার মানতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে জেলায় জেলায়। কতো ঘটা,কতো আড়ম্বর,কতো প্রচারের জয়ঢাক। তো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর কী করবে তারা? এদিকে কর্মসংস্থানের হুংকার,অন্যদিকে ৭ বছর ধরে নিয়োগ নেই। দ্বিচারিতা দেখলে ঘেন্না হয়। আঁতকে উঠি আমাদের সময় এই রকম হলে কি হতো কল্পনা করে।মনে পড়ে যায় বছর বছর এসএসসি,হাজার হাজার বেকার ছেলেমেয়ের পায়ের তলায় জমি খুঁজে পাবার দিনগুলো। তারপর মনে হয় আজ এখানে ভিক্ষা দেওয়া হয়, দয়া করা হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিস্টেমকে ধ্বংস করে যুবসমাজকে মেরুদণ্ডহীন করে রাখার ব্যবস্থা হয়। তাই শূন্যপদ গোপন রাখার নোংরা খেলা চলে।

তাকিয়ে দেখুন ছেলেমেয়ে গুলোর মুখের দিকে। ক্লান্ত,অবসন্ন কিন্তু প্রত্যয়ী।তারা বলছিলেন কর্মহীন হয়ে সমাজের উচ্ছিষ্ট ভোগী হয়ে, দয়ার ভাতা হাত পেতে নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অনশনে মরে যাওয়া ও অনেক গৌরবের।হতাশ মুখ গুলো বলছিলো, শিক্ষিত হওয়া টা কি অপরাধ ছিল? অপরাধ ছিলো সরকারের কথায় আস্থা রাখা? নয়ত আজ আমাদের এই অবস্থা কেন?

তবে এ লড়াই কোনো রাজনৈতিক দলের লড়াই নয়, এ লড়াই মানুষের লড়াই, এ লড়াই একটা জাতিকে ভিক্ষাজীবি‌ তে পরিণত করে দেবার চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াই, এ লড়াই শিক্ষিতের মর্যাদা রক্ষার লড়াই, এ লড়াই অধিকার বুঝে নেবার লড়াই, এ লড়াই আগামী প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য আত্মবলিদানের লড়াই। আপনি যে পন্থী ই হন না কেন, আপনার আদর্শে যে নেতা নেত্রীই থাকুন না কেন, এ লড়াই এর পাশে দাঁড়ান। যদি মনে করেন আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ পরিবেশ, একটা শক্ত ভিত, একটা স্বচ্ছ পরিকাঠামো রেখে যাওয়া দরকার তবে ঘুম ভাঙুক। ওদের সমর্থন করুন। হোলির রঙে মাতার পাশাপাশি একটা করে জয় তিলক লাগান ওই যোদ্ধাদের জন্য। ফেসবুকের পাতায়,সোস্যাল মিডিয়ায় একটা করে পোস্ট করুন ওদের জন্য। চেতনা হোক সরকারের, জয় হোক আন্দোলনের। ওদের জয়েই নিরাপদ হবে ভবিষ্যতের পথ। এগিয়ে আসুন নিজ স্বার্থে, ভবিষ্যতের মুখ চেয়ে।

0 Shares

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.